বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

                             বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ

প্রিয় পাঠক, আজ আমরা আলোচনা করব কিভাবে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করা যায়। বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে আমাদের পোস্ট সম্পূর্ণ দেখুন।  

ভূমিকা

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাদের প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো মেয়েদের নিরাপদ পথচলা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহনকে নারীবান্ধব ও যৌন হয়রানিমুক্ত করতে হবে। যৌতুক নিরোধ আইনে সাজার পরিমাণ বাড়িয়ে আইনকে যুগোপযোগী করার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

 বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করণীয় : 

বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক সমস্যা হচ্ছে বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে দেশে আইন হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে জানাতে প্রতিনিয়ত সভা-সমাবেশ আর মানববন্ধন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু তাতে বাল্যবিবাহ থেমে থাকছে না। প্রত্যন্ত গ্রাম আর শহরের বস্তিগুলোতে তো বটেই, তথাকথিত শিক্ষিত আর সচেতন সমাজেও ঘটছে বাল্যবিবাহের ঘটনা।

সম্প্রতি কমনওয়েলথ নারী ফোরামে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের কম মেয়েদের বিয়ের হার ২ ৫ সালের ৬২ শতাংশ থেকে কমে ২০১৭ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো খবর। কিন্তু এই ৪৭ শতাংশও তো কম নয়।

মেয়ের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে বাল্যবিবাহ যে খুব একটা সুখকর সমাধান নয়, সেটি বাবা-মায়েরা ভালোভাবেই জানেন। তবে এর বিকল্প পথটির ঠিকানাও খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। তাই এই সামাজিক ব্যাধিকে রুখতে হলে বাল্যবিবাহ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বাল্যবিবাহের বিকল্প পথগুলো সম্পর্কে সবাইকে স্বচ্ছ ধারণা দিতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা সৃষ্টির পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নেটওয়ার্ক ‘গার্লস নট ব্রাইড’ নারীর জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে: ১. নারীর ক্ষমতায়ন ২. নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের সচেতনতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ৩. নারীর কর্মসংস্থান ৪. বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কঠোর আইন ও তার প্রয়োগ।

এক কথায় তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের পথটি হতে হবে একেবারে দৃশ্যমান, যা দেখে বিয়েকেই মেয়ের জন্য একমাত্র সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনার ধ্যানধারণা থেকে বাবা-মায়েরা বেরিয়ে আসবেন।

বাল্য বিবাহ ও প্রতিরোধ ভাবনা:  

বাল্যবিবাহ বাংলাদেশে একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। ইউনিসেফ এর তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়, এবং ২২ শতাংশের ১৫ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়। বাল্যবিবাহ মেয়েদের উপর স্বাস্থ্য সমস্যা সহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাল্য বিবাহের কারণে তাদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়া, গার্হস্থ্য সহিংসতা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে এখনো বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ৫১ শতাংশ মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়।

বাংলাদেশের অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাদের মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়। বাল্যবিবাহকে প্রায়ই আর্থিক বোঝা কমানোর এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা উন্নত করার উপায় হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং লিঙ্গ বৈষম্য কন্যা সন্তান ও নারীদের অবমূল্যায়নের দিকে নিয়ে যায়। বাল্যবিবাহকে প্রায়ই মেয়েদের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষার উপায় হিসেবে দেখা হয় এবং তাদের স্বাধীনতা ও চলাফেরা সীমিত করা হয়।সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে এখনো বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ৫১ শতাংশ মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়।

শিক্ষার অভাব এবং বাল্যবিবাহের নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এর প্রসারে ভূমিকা রাখে। গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক সুস্থতার উপর বাল্যবিবাহের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে অবগত নয়।বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি বাল্যবিবাহের ধারণাকে প্রচার করে, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে। এই নিয়মগুলি প্রায়শই ধর্মীয় নেতা, সমাজের প্রবীণ এবং পরিবারের সদস্যদের দ্বারা জোরালোভাবে সমর্থন করা হয়।

বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের মেয়েদের এবং তাদের পরিবারের জীবনে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে সব মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয় তাদেরসহ শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে, সেইসাথে গর্ভাবস্থা এবং প্রসবের সাথে সম্পর্কিত জটিলতার ঝুঁকি থাকে। তারা তাদের স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হতে পারে।

যে সকল মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়- তারা প্রায়ই স্কুল ছেড়ে দেয়, যা তাদের শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ সীমিত করে। এটি দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের চক্রকে স্থায়ী করতে অবদান রাখতে পারে। বাল্যবিবাহ মেয়েদের অর্থনৈতিক সুযোগে প্রবেশ সীমিত করতে পারে এবং আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে। এটি দারিদ্র্য এবং লিঙ্গ বৈষম্যের চক্রকে স্থায়ী করতে পারে।

বাল্য বিবাহ এর কুফল ও করণীয়

বাল্যবিয়ে কখনও ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না। তাই সর্বদা নেতিবাচক ফলবাহী বাল্যবিয়ে বন্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবুও আমাদের দেশে বাল্যবিয়ে থেমে নেই। বাল্যবিয়ে বা শিশু বিয়ে করতে আমাদের সবার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। বাল্যবিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষতি করার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকেও ব্যাহত করে।

১৯২৯ সালে বাল্যবিয়ে বন্ধে বাল্যবিবাহ নিরোধ ‘আইন’ প্রণীত হয়। এই আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর এবং ছেলেদের ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮৪ সালে এই আইনে পরিবর্তন এনে মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয় ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। সর্বশেষ বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭’ পাস হয়। এই আইনেও মেয়েদের বিয়ের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর ও ছেলেদের কমপক্ষে ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়।

 প্রাপ্তবয়স্ক কেউ বাল্যবিয়ে করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এ জন্য দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধানও এতে রাখা হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেয়া হলে এক মাসের আটকাদেশ ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তির যোগ্য হবে মর্মে এতে বিধান রয়েছে। বাল্যবিয়ের সঙ্গে পিতামাতা বা অন্যরা জড়িত থাকলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড ৫০ হাজার টাকা কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রাখা আছে।

 জরিমানার টাকা না দিলে আরও তিন মাসের জেল খাটার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। বাল্যবিয়ে নিবন্ধন করলে নিবন্ধকের লাইসেন্স বাতিল হবে। যিনি বিয়ে পড়াবেন কিংবা নিবন্ধন করবেন তারাও ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বর্তমান সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ১০৯ নম্বরে কল বা এসএমএসের অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রেখেছে। এর ফলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করছে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন গণযোগাযোগ অধিদপ্তর বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ও সচেতনতা সৃষ্টিতে উঠান বৈঠক, মহিলা সমাবেশ, সিনেমা শো’র মতো বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রচার করে আসছে। সরকার মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণকে অনুপ্রাণিত করতে শিক্ষা উপবৃত্তি চালু করেছে। এর ফলে মেয়েদের শিক্ষাক্ষেত্রে ঝরে পড়ার হার হ্রাস পাচ্ছে, যা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।          

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে লন্ডনে গার্লস সামিটে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বাল্যবিয়ের হার শূন্যে নামিয়ে আনা ও ১৫-২১ বছরের মধ্যে সংঘটিত বাল্যবিয়ের হার এক তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। ২০০৭ সালে বাল্যবিয়ের হার (১৮ বছরের নিচে) ছিল ৭৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে বাল্যবিয়ের হার (১৮ বছরের নিচে) ছিল ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৭ সালে বাল্যবিয়ের হার (১৫ বছরের নিচে) ছিল ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৭ সালে বাল্যবিয়ের হার (১৫ বছরের নিচে) ছিল ৩২ শতাংশ। ২০১৭ সালে বাল্যবিয়ের হার (১৫ বছরের নিচে) ১০.৭-এ নেমে এসেছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাল্যবিয়ে হ্রাসের যে প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে আশা করা যায়, ২০৪১ সালে আগেই বাংলাদেশ বাল্যবিয়েমুক্ত দেশে পরিণত হবে। 

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করে থাকে। এর ফলে বাংলাদেশ বাল্যবিয়ের হার হ্রাস পেলেও তা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। তাই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ পিতামাতার ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি এবং তা সবার আগে। পিতামাতাকে মনে রাখতে হবে অল্প বয়সে বিয়ে দিলে মেয়ের শুধু সুন্দর ভবিষ্যৎই নষ্ট হয় না, মেয়েদের জীবনও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জন্মের পরপরই জন্ম নিবন্ধন করতে হবে। কারণ অনেকেই দেরিতে জন্ম নিবন্ধন করে বয়স বাড়িয়ে মেয়েদের বিয়ে দেয়। বিয়ের রেজিস্ট্রারকারীরা যেন অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়ের বিয়ে না পড়ান, তা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে মেয়েরাও ছেলেদের মতো সমান ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই অল্প বয়সে বিয়ে না দিয়ে তাদের মধ্যে এমন মনোভাব তৈরি করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের দৃষ্টান্ত ছেলেমেয়েদের কাছে বেশি করে তুলে ধরতে হবে। এতে তাদের মধ্যে সাহসের সঞ্চার হবে এবং নিজেরাও প্রতিষ্ঠিত হতে অনুপ্রাণিত হবে।

বাল্য বিবাহ রোধে সামাজিক সচেতনতা

বাল্যবিবাহ আমাদের দেশে একটি সামাজিক ব্যাধি। বর্তমান আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বাধা হচ্ছে এই বাল্যবিবাহ। সাধারণত অপ্রাপ্ত বয়সে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বিবাহকে বাল্যবিবাহ বলে। বাংলাদেশের আইনে ১৮ বছর বয়সে মেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং ২১ বছর বয়সে ছেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এই বয়স কম হতে পারে। বাল্যবিবাহ সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়। অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই এর হার বেশি।

 আমাদের বাংলাদেশে এই বাল্যবিবাহের হার আগের তুলনায় কমলেও সন্তোষজনক নয়। জাতিসংঘের ইউনেস্কোর সর্বশেষ এক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫৯ শতাংশ। কিন্তু সরকারি হিসাবমতে এই হার ৫২ শতাংশ। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে ৪র্থতম। আর সংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের পরেই ২য় অবস্থানে। বাংলাদেশে প্রায় ৩৯ লাখ ৩৪ হাজার মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়েছে। এটা আমাদের দেশের জন্য সুখবর নয়। কারণ যেখানে আমরা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি সেখানে নারীর এই বাল্যবিবাহ কাম্য নয়। 

কারণ যেকোনো দেশ উন্নত হওয়ার পেছনে নারীর ক্ষমতায়ন অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অনেকগুলো কারণ রয়েছে; যেমন-অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, দরিদ্রতা ইত্যাদি।  সাধারণত দরিদ্র পরিবার তাদের কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করে অল্প বয়সে অযোগ্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কারণ বাল্যবিবাহ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অল্প বয়সে বিবাহের কারণে অল্প বয়সেই মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে যায়, যা তাদের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই অবস্থার উত্তরণের জন্য চাই সামাজিক সচেতনতা। 

কারণ সামাজিকভাবে প্রতিরোধ ছাড়া এটা নির্মূল সম্ভব না। আইন করে হয়তোবা এর হার কিছুটা কমানো যাবে, কিন্তু সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করার জন্য আমাদের গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায়, শহরে প্রতিরোধ গড়তে হবে সামাজিকভাবে। এর জন্য তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ তরুণ সমাজ যেখানে এগিয়ে আসে সেটার সফলতা নিশ্চিত থাকে। তাই তরুণ সমাজকে দায়িত্ব নিয়ে তাদের প্রত্যেকের জেলায় এই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তাদেরকে নিজ জেলায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় গিয়ে সেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে সভা বা সেমিনার করতে হবে। 

বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে এলাকায় মাইকিং করতে হবে, বিলিপত্র দিতে হবে, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সচেতন মানুষদের সঙ্গে নিয়ে এলাকাবাসীকে সচেতন করতে হবে। তাহলেই কেবল এই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব। স্থানীয়ভাবে যারা গরীব, অসচ্ছল তাদের একাধিক সন্তান থাকলে তার মধ্যে কন্যাসন্তানের লেখাপড়ার দায়িত্ব এলাকার বিত্তবান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিতে হবে। তাহলে সেই পিতা কন্যাকে বোঝা হিসেবে নিবে না। আর দেশের সব জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। যাতে করে কোনো পরিবার এটা না ভাবে যে তাদের বৃদ্ধকালে পুত্রই একমাত্র সম্বল।

 নারী হচ্ছে পরের বাড়ির সম্পদ—এই ধারণা থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য দেশের সব সেক্টরে নারীকে অংশগ্রহণ করাতে হবে। এবং যে পরিবার তাদের সন্তানকে বাল্যবিবাহ করাবে সেই পরিবারকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখতে হবে। তাতে তারা অনুতপ্ত হবে এবং অন্যেরা শিক্ষা নেবে। আমাদের দেশ এখন ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখানোর জন্য এগিয়ে যাচ্ছে।  এই পথে সফলতার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ দূর করে নারীকে স্বাধীনভাবে তার জীবন নির্বাহ করতে দেওয়া। তাহলেই আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবো। 

সর্বশেষ 

আমাদের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হবে । মনে রাখতে হবে আমাদের দেশে প্রথম থেকেই আইন আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব হয়নি। তাই আমরা তরুণ সমাজ যদি উদ্যোগী হয়ে নিজ নিজ এলাকায় সংঘবদ্ধ হয়ে এই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি তাই এই ক্ষেত্রে অবশ্যই সফলতা আসবে। আমাদের প্রত্যেককে বাল্যবিবাহ মুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নারীকে স্বাধীনভাবে তার কর্ম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। আসুন আমরা সকলে মিলে এই সমাজ থেকে বাল্যবিবাহের মত একটি সামাজিক ব্যাধিকে দূর করি এবং সুখী সমৃদ্ধ স্বদেশ গড়ি।

Comments